শনিবার ১৩ জুন ২০২৬
Online Edition

ঢিলেঢালা পুলিশি নিরাপত্তায় বেপরোয়া অপরাধীরা 

 

* তিন মাসে গণপিটুনিতে নিহত ৬৭ : অধিকার

* দুই মাসে নারী-শিশু খুন ১৪৬ : এমএসএফ

নাছির উদ্দিন শোয়েব : দেশের আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে গত শুক্রবার সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনীর কর্মকর্তাদের আরও ৬০ দিনের জন্য ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা দেয়া হয়েছে। এরআগে এই ক্ষমতা ৬০ দিনের জন্য দিয়েছিল অন্তর্বর্তী সরকার। পাঁচ আগস্ট ছাত্র জনতার অভ্যুত্থানের পর থেকে অনেকটাই ঢিলেঢালা অবস্থায় রয়েছে নিরাপত্তা ব্যবস্থা। পুলিশের নিষ্কৃয়তার সুযোগে অপরাধীরা মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। বিভিন্ন স্থানে দুর্ধর্ষ ডাকাতি, চাঞ্চল্যকর হত্যাকান্ড এবং অপহরণের ঘটনা ঘটছে। অপরাধমূলক কর্মকান্ড নিয়ন্ত্রণে পুলিশ-র‌্যাবের সক্রিয় তৎপরতা চোখে পড়ছে না বলে সাধারণ মানুষের অভিযোগ। জুলাই আগস্ট আন্দোলনে নির্বিচারে অস্ত্র ব্যবহারের কারণে সমালোচনার মুখে পড়ে পুলিশ। ফলে অপরাধ নিয়ন্ত্রণে পুলিশের পাশাপাশি সারাদেশে সশস্ত্র বাহিনীকে প্রস্তুত রাখা হয়। এরপর তাদেরকে দেয়া হয় বিচারিক ক্ষমতা। পাশাপাশি পুলিশ সংস্কারের ওপর সবচেয়ে বেশি জোর দিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। ইতোমধ্যে শীর্ষ থেকে মাঠ পর্যায়ে পুলিশের বড় একটি অংশকে রদবদল করা হয়েছে। 

হঠাৎ ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে কয়েকটি চাঞ্চল্যকর হত্যাকান্ড ঘটেছে। রাজধানীর আজিমপুরে দুই শিশুসন্তানকে খুন করার পর বাবা আত্মহত্যার চেষ্টা করেন। ধানমন্ডিতে প্রবাসী চিকিৎসককে খুন করা হয়েছে। এর আগে মোহাম্মদপুরে সেনা ও র‌্যাবের পরিচয়ে দুর্ধর্ষ ডাকাতির ঘটনা ঘটে। গত শুক্রবার সকালে রাজধানীর আজিমপুর এলাকার একটি বাসায় ডাকাতি হয়। ডাকাতরা মালামালের সঙ্গে আট মাসের দুধের শিশু আরিসা জান্নাত জাইফাকে ছিনিয়ে নিয়ে যায়। ডাকাতি ও অপহরণের মূল পরিকল্পনাকারী হিসেবে অভিযুক্ত ফাতেমা আক্তার শাপলাকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব। মোহাম্মদপুরের নবোদয় হাউজিংয়ের একটি বাসা থেকে শিশুটিকে উদ্ধার করে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। শিশুটিকে উদ্ধারের পর সাংবাদিক সম্মেলন করে র‌্যাবের মুখপাত্র লেফটেন্যান্ট কর্নেল মুনিম ফেরদৌস বলেন, লালবাগ থানাধীন আজিমপুর মেডিকেল স্টাফ কোয়ার্টারের একটি বাসা থেকে নগদ টাকা ও স্বর্ণালংকার ডাকাতির সময় শিশুটিকে অপহরণ করা হয় মুক্তিপণ আদায়ের জন্য। র‌্যাব জানায়, চাচাতো ভাই পরিচয় দিয়ে ফাতেমা আরও তিন যুবককে বাসায় নিয়ে এ ঘটনা ঘটান।

অন্যদিকে ধানমন্ডির একটি বাসায় ঢুকে যুক্তরাজ্য প্রবাসী চিকিৎসক এ কে এম আব্দুর রশিদকে (৮৫) ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করে হত্যা করা হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে ধানমন্ডি à§®/এ রোডের একটি পাঁচতলা বাড়ির দোতলায় এই হত্যাকা- ঘটে। ওই বাড়ির মালিক আব্দুল রশিদ। তিনি গত সেপ্টেম্বর মাসে যুক্তরাজ্য থেকে দেশে আসেন। বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে হঠাৎ তাদের বাসা থেকে চিৎকারের শব্দ শুনে বাড়ির ভাড়াটিয়ারা ছুটে আসেন। তখন কয়েকজন পালিয়ে যায়। এ ঘটনায় মামলা হলেও গতকাল পর্যন্ত কোনো আসামিকে আটক করতে পারেনি পুলিশ। এ বিষয়ে হাজারীবাগ থানার ওসি সাইফুল ইসলাম বলেন, ক্লোজ সার্কিট (সিসি) ক্যামেরার ফুটেজে ওই ভবনে à§© ব্যক্তিকে প্রবেশ করতে দেখা গেছে। এ হত্যাকা- নিয়ে পুলিশ তদন্ত করছে। দ্রুতই আসামি গ্রেফতার করা হবে। অন্যদিকে, গত ১০ নবেম্বর দুপচাঁচিয়ায় বগুড়া-নওগাঁ আঞ্চলিক মহাসড়ক সংলগ্ন ‘আজিজয়া মঞ্জিল’ বাড়িতে খুন হন গৃহবধু উম্মে সালমা। এ ঘটনায় নিহতের ছোট ছেলে সাদ বিন আজিজুরকে গ্রেফতার করে র‌্যাব জানিয়েছিল, হাতখরচের টাকার জন্য মাকে হত্যা করেছেন সাদ। পরে লাশ ডিপ ফ্রিজে রেখে দেন। এরপর পুলিশ জানায়, নিহতের ছেলে নয়, বাড়ির ভাড়াটিয়াই এই হত্যাকা- ঘটিয়েছেন। এ ঘটনায় তিনজনকে গ্রেফতার করা হয়। à§§à§« নভেম্বর দুপুরে দুপচাঁচিয়া থানার পুলিশ জানায়, হত্যাকা-ের সময় ওই বাসা থেকে খোয়া যাওয়া মোবাইল ও ওয়াইফাই রাউটারের সূত্র ধরে বাসার ভাড়াটিয়া মাবিয়া আক্তারকে গ্রেফতার করা হয়েছে

মানবাধিকার সংগঠন অধিকারের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত ৬৭ জন গণপিটুনিতে নিহত হন। এর মধ্যে à§§ জুলাই থেকে à§« আগস্ট পর্যন্ত ৩৬ জন এবং ৯ আগস্ট থেকে ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত à§©à§§ জন নিহত হন। অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা নেয়ার পর (৯ আগস্ট থেকে ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত) দেশে রাজনৈতিক সহিংসতায় প্রাণ গেছে ৫২ জনের। আরেকটি মানবাধিকার সংস্থা ‘মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের (এমএসএফ) গত দুই মাসের পরিসংখ্যান বলছে, এ সময়ে সারা দেশে শুধু নারী ও শিশু খুন হয়েছে ১৪৬ জন। এর মধ্যে সেপ্টেম্বরে ৬২ জন আর অক্টোবরে ৮৪ জন। পুলিশ সদর দপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, à§« আগস্ট ও এর আগে-পরে দুর্বৃত্তরা থানা, কারাগার ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে à§« হাজার ৮২৯টি আগ্নেয়াস্ত্র এবং ৬ লাখ à§«à§§ হাজার ৬০৯টি গুলি লুটে নেয়। এর মধ্যে ৪ হাজার ২৮৩টি অস্ত্র এবং à§© লাখ ৮৮ হাজার ১৮২টি গুলি এরই মধ্যে উদ্ধার করা হয়েছে। লুট হওয়া অস্ত্রের মধ্যে অত্যাধুনিক অ্যাসল্ট রাইফেল ও স্নাইপার রাইফেল রয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত বিপুলসংখ্যক গোলাবারুদসহ ৩২টি ভারী অস্ত্র উদ্ধার হয়নি।

ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) মাসিক অপরাধ পর্যালোচনা ও পরিসংখ্যান বলছে, গত ১০ মাসে ঢাকার বিভিন্ন থানায় খুনের মামলা হয়েছে ৪৬০টি। এর মধ্যে সেপ্টেম্বরেই হয়েছে সর্বোচ্চ ১৪৮টি। এছাড়া আগস্টে ১১৯টি, জুলাইয়ে ৫৯টি, অক্টোবরে ৫৮টি, মার্চে à§§à§®, মে মাসে ১৬, এপ্রিলে ১৪, জুনে à§§à§©, জানুয়ারিতে à§§à§§ ও ফেব্রুয়ারিতে হত্যা মামলা হয়েছে ৪টি। এছাড়া গত ১০ মাসে দস্যুতার ১৮৩টি, ডাকাতির ২৯টি, অপহরণের ৮৭টি ও চুরির ঘটনায় মামলা হয়েছে ৫০৯টি। এর মধ্যে আগস্ট, সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরে দস্যুতার মামলা ৩৯টি, ডাকাতি ১৪টি, অপহরণের ৪৭টি ও চুরির মামলা হয়েছে ৯৬টি। তবে পুলিশের ঝামেলা এড়াতে চুরি-ছিনতাইয়ের মতো ঘটনায় থানায় অভিযোগ দিতে যান না অনেকেই। এ কারণে অপরাধের সঠিক চিত্র মামলার এই পরিসংখ্যানে উঠে আসে না। 

অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ত নিয়ে দেশের সব জেলার পুলিশ, সব রেঞ্জ ডিআইজি, মহানগর কমিশনার এবং সব থানার ওসি পদে নতুনদের পদায়ন করা হয়। পুলিশে এককভাবে সবচেয়ে বড় ইউনিট হলো ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। এখানে অন্তত ৩২ হাজার সদস্য এখানে কাজ করেন। এ পর্যন্ত এখানকার ১৮ হাজার সদস্যকে বদলি করা হয়েছে। এ সময়ে সারা দেশে পোশাকধারী দুই লাখ দুই হাজার পুলিশের বিপরীতে রদবদল করা হয়েছে ৪৫ হাজার ৪২ সদস্যকে। সে হিসাবে প্রায় ২৫ শতাংশ পুলিশের চেয়ার বদলে গেছে। অল্প সময়ে এত সংখ্যক পুলিশ সদস্যের কর্মস্থল বদলের ঘটনা দেশে আগে কখনো হয়নি। সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, কাজে গতি আনতে এই বদলি। গেল দেড় দশকে নানা বিতর্কিত কর্মকা-ে জড়ায় পুলিশ। গণঅভ্যুত্থানে পুলিশের বিরুদ্ধে মানুষের ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশও দেখা গেছে। পুলিশ এ পরিস্থিতি থেকে বের হওয়ার চেষ্টায় আছে। যারা নতুনভাবে পদায়ন পাচ্ছেন, তাদের নিজ নিজ এলাকার অপরাধীদের নেটওয়ার্ক সম্পর্কে জানতে কিছুটা সময় লাগছে। অপরাধীরা এর সুযোগ নিতে পারে। কিছুদিন গেলে রদবদলের প্রভাব দৃশ্যমান হবে। কারণ, প্রতিনিয়ত নতুন নতুন ঘটনাপ্রবাহ এবং অপ্রীতিকর পরিস্থিতি মোকাবিলার চ্যালেঞ্জ পুলিশের সামনে আসছে।

দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে গত বুধবার সেনসদর এক ব্রিফিং করে সেনাবাহিনী জানিয়েছে তারা দেশের সাত শতাধিক বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করেছে। লুট হয়ে যাওয়া ৬ হাজার অস্ত্র দুই লক্ষাধিক গুলি উদ্ধার করেছে এবং এতে সম্পৃক্ত আড়াই হাজার ব্যক্তিকে গ্রেফতার করেছে। ব্রিফিংয়ে সেনা সদরের কর্নেল ইন্তেখাব হায়দার খান বলেন, পরিস্থিতি আরো উন্নতির জন্য সমন্বিতভাবে কাজ করছে সেনাবাহিনী। ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা পাওয়ার পরের যে স্ট্যাটিস্টিক সেটাতে আগের তুলনায় অপরাধের নথিভুক্ত রেকর্ডের সংখ্যা কমেছে। তারমানে পরিস্থিতির অবনতি হয়নি। সেনবাহিনী এবং অন্যান্য গোয়েন্দা সংস্থা সবাইকে সম্পৃক্ত করে আমাদের চেষ্টা অব্যাহত আছে এবং আমরা আশা করছি ভবিষ্যতে সিচ্যুয়েশন আরো ভালো হবে বলে বলেন কর্নেল খান। এছাড়া সরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেছেন, জুলাই-আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানের মুখে স্বৈারাচারী আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ৮ আগস্ট ক্ষমতা গ্রহণের ১০০ দিনে সরকার দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বজায় রাখতে সফল হয়েছে। গত ১০ নবেম্বর নিজ কার্যালয়ে জাতীয় বার্তা সংস্থা বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার (বাসস) সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, সারা দেশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় আমরা সফল হয়েছি। সরকারের সময়োপযোগী ও বিচক্ষণ পদক্ষেপের ফলে দেশের বর্তমান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সন্তোষজনক। তবে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির আরও উন্নয়ন ঘটানোর সুযোগ রয়েছে। এরআগে ৪ সেপ্টেম্বর স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেছেন, পুলিশের ইমেজ ধীরে ধীরে উন্নত হচ্ছে। একদিনে সব ঠিক হবে না, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ঠিক হবে। সময় দিতে হবে। সচিবালয়ে এক সভা শেষে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে এসব কথা বলেন তিনি। স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, পুলিশের ইমেজ কিন্তু আস্তে-আস্তে উন্নত হচ্ছে। আমার কাছে এ রকম কোনো কিছু নাই যে, আমি একদিনে সব উন্নতি করে ফেলব। আমি তো একদিনে পারবো না, সময় দিতে হবে। আমি ব্যবস্থা নিচ্ছি।

অপরদিকে অন্তর্বর্তী সরকারের ১০০ দিন পূর্তি উপলক্ষে রোববার অন্তর্বর্তী সরকারের যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার দাবি, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির যথেষ্ট অগ্রগতি হয়েছে। যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের অগ্রগতি বিষয়ক সাংবাদিক সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে উপদেষ্টা এসব কথা বলেন। যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা বলেন, আপনারা জানেন যে, তিন মাস আগে আমরা কোন অবস্থায় ছিলাম, এখন কোন অবস্থায় আছি, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির যথেষ্ট অগ্রগতি হয়েছে। তবে যে পরিস্থিতিতে আমরা সরকারের দায়িত্ব পেয়েছি, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী একটা ভঙ্গুর অবস্থায়, পলাতক অবস্থায় ছিল। সেই অবস্থা থেকে এখন দৃশ্যমান পরিবর্তন হচ্ছে এবং সামনের দিনগুলোতে রিক্রুটমেন্ট এবং অনেক ভেহিকেল আসলে খোয়া গিয়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যেগুলো সংস্কারের কাজ চলমান আছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ